স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার আদ্যোপান্ত

স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার আদ্যোপান্ত

হেলদি লাইফস্টাইল বা স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা শুনলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে এথলেট, স্পোর্টসম্যান, মডেল বা অভিনয়শিল্পীদের ছককাটা রুটিনবদ্ধ জীবনযাত্রার ছবি। প্রফেশনাল জীবনে ফিট থাকতে স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা মেনে চলেন অনেকেই। অথচ প্রফেশনাল জীবনের চেয়ে সাধারন ব্যক্তিজীবনে স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয় বরং সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে এর বিকল্প নেই।

স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা কি?

স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা এমন কিছু দৈনন্দিন স্বাস্থ্যসম্মত অভ্যাস বা কার্যের সমষ্টি যা প্রতিনিয়ত এবং দীর্ঘমেয়াদে আপনার শরীর ও মনের সুস্থতা নিশ্চিত করে। তবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার অর্থই যে কেটো ডায়েট বা জিমে এক্সারসাইজ, তা নয়। বরং স্বাভাবিক জীবনে রোগহীন ও সুস্থ থাকতে কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের চর্চা এবং অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস বর্জনের মাধ্যমেও এমন জীবনযাপন করা সম্ভব। চাহিদাভেদে প্রতিটি মানুষের স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার ধরন অন্য জনের থেকে ভিন্ন হয়। বয়স, পেশা, শারীরিক গঠন, পরিস্থিতি, কর্মক্ষমতা ইত্যাদি ভেদে স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাত্রার আদর্শ মানের পার্থক্য হয়ে থাকে। তাই অন্যের অনুসরিত লাইফস্টাইল হুবুহু অনুসরন করার পূর্বে তা নিজের জন্য উপযুক্ত কিনা তা যথাযথ যাচাই বাছাই করে নেওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে অসচেতনতা বা সঠিক জ্ঞানের অভাব বিপদের কারণ হতে পারে।

কেন চাই স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা?

বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার, দুষিত পরিবেশ এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার কারনে মানুষের জীবনে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে, বাড়ছে প্রতিকারহীন অপ্রতিরোধ্য অসুখ। সাথে সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে বিভিন্ন মানসিক ও শারীরিক জটিলতা। স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা আপনাকে অধিকাংশ সমস্যা থেকে রক্ষা করবে, নিশ্চিত করবে দুশ্চিন্তাহীন, সাচ্ছন্দ্যময়, নিরোগ জীবন। স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার বিভিন্নমুখী উপকারিতাগুলো হলো-

·         রোগ প্রতিরোধশক্তি বৃদ্ধি: নিয়মিত স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের ফলে দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সঠিক খাদ্যভাসের ফলে দেহে সুষম পুষ্টির সঞ্চার ঘটে। নিয়মিত এক্সারসাইজ দেহের পেশিগুলোকে কর্মক্ষম ও সচল রাখতে সাহায্য করে।

·         মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি: স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন শুধু দৈহিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও সমান উপকারী। দেহ ও মনের সম্পর্কের কারনে দৈহিক সুস্থতা মানসিক সুস্থতা রক্ষায় সাহায্য করে। উপরন্তু স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার অন্যতম অংশ মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন চর্চা।

·         কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি: স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার ফলে জীবন একটি সুষ্ঠ নিয়মে পরিচালিত হয়। এতে সময় ও শক্তির অপব্যবহার কমে তা সঠিকক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, এতে স্বাভাবিকের তুলনায় কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এছাড়া শারিরীক ও মানসিক ব্যায়াম কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

·         ব্যয় সাশ্রয়: ইংরেজীতে একটা প্রবাদ আছে ‘প্রতিদিন একটি আপেল ডাক্তার দূরে রাখে’। তেমনি প্রতিদিনের স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা চিকিৎসা ও ঔষধের বহুলব্যয় বাঁচিয়ে দেয়।

কিছু ভুল ধারনা…

·         হেলদি লাইফস্টাইল অর্থ বডি বিল্ডআপ কিংবা অসম ডায়েট কন্ট্রোলের মাধ্যমে স্বাস্থ্য কমানো নয়, বরং আপনার স্বাস্থ্যের প্রয়োজনানুসারে সঠিক ও সুষম পুষ্টি ও শক্তির যোগান দেওয়া। স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা ধীরে ধীরে আপনার জীবন, শরীর, মনে সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে; যা আপনাকে বহুদিন সুবিধা দিবে।

·         স্বাস্থ্যকর লাইফস্টাইলের জন্য সবসময় যে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে এমন নয়। আপনি নিজে নিজে রিসার্স করে আপনার উপযুক্ত লাইফস্টাইল এবং অভ্যাস বাছাই করতে পারেন। তবে দ্রুত ফল পেতে কিংবা কঠোর খাদ্যভ্যাস বা ভারি এক্সারসাইজ অনুসরনের পূর্বে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিবেন।

·         স্বাস্থ্যকর লাইফস্টাইল এমন নয় যে আপনাকে একদিনে পরিবর্তন আনতে হবে, পুরো জীবন যাত্রা একেবারে বদলে ফেলতে হবে। বরং এক এক করে স্বাস্থ্যকর অভ্যাসগুলোকে চিনে, তার প্রয়োজনীয়তা বুঝে, তা মানার ইচ্ছেশক্তি তৈরী করে, ধীরে ধীরে তা নিজের জীবনে  প্রয়োগ করতে হবে। এটি সময়সাপেক্ষ, কিন্তু ধৈর্য ধরলে দীর্ঘদিন ফলভোগ করতে পারবেন।

কিভাবে নিশ্চিত করবেন স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা?

স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা মূলত বেশ কিছু স্বাস্থ্যসম্মত অভ্যাসের সমষ্টি। আপনার প্রতিদিনের স্বাভাবিক অভ্যাসগুলোয় কিছুটা পরিবর্তন আনতে পারলে আপনার জীবনও হয়ে উঠতে পারে স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার উদাহরণ। স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার মৌলিক কিছু বিষয় হলো-

  • খাদ্যভ্যাসঃ
  • প্রতিদিন ২-৩ লিটার পানি পান করতে হবে।
  • খাদ্যতালিকায় সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য যেমন শাকসবজি, ফলমূল, বাদাম, শস্যদানা, স্বাস্থ্যকর তেল ও চর্বিজাতীয় খাদ্য, অমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ খাদ্য রাখতে হবে।
  • রেড মিট, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, কোমল পাণীয়, ফাস্টফুড, চিনি এবং অতিরিক্ত সোডিয়ামযুক্ত খাদ্য পরিহার করতে হবে।
  • খাদ্যগ্রহন হবে পরিমিত, নিয়মিত এবং সময়মাফিক।
  • ধুমপান, নেশাদ্রব্য বা ক্ষতিকর তরল পানীয় থেকে দূরে থাকতে হবে।
  • ডায়াবেটিক, হৃদরোগ বা অন্য কোনো শারিরীক জটিলতা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যভাস করা উচিত। 
  • দৈনন্দিন অভ্যাসঃ
  • প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করতে হবে।
  • দিনের কাজ দিনে শেষ করার অভ্যাস করতে হবে। প্রয়োজনে দিনের শুরুতে কাজের তালিকা বানিয়ে নিতে পারেন।
  • রাতের খাওয়ার পর কিছুটা সময় পর ঘুমাতে যাওয়া উচিত।
  • রাতে দ্রুত ঘুমানোর অভ্যাস করতে হবে। প্রতিদিন অন্তত ৫-৭ ঘন্টা ঘুম নিশ্চিত করতে হবে।
  • পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার অভ্যাস রাখতে হবে।
  • ত্বক ও চুলের যত্ন নিয়মিত যত্ন নিতে হবে।
  • এক্সারসাইজঃ
  • প্রতিদিন নিয়মিত আধাঘন্টা থেকে এক ঘন্টা হাটার অভ্যাস করতে হবে।
  • প্রতিদিন কিছুটা ফিজিক্যাল কাজ করার অভ্যাস করতে হবে।
  • নিয়মিত আধাঘন্টা ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করার অভ্যাস করতে পারেন।
  • একটানা কাজের ফাঁকে ফাঁকে কিছু ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করতে পারেন।
  • মানসিক সুস্থতাঃ
  • নিজের ভিতরে পজিটিভ এনার্জি বৃদ্ধি করতে হবে। প্রতিটি বিষয়ের ইতিবাচক দিক ভেবে তা মেনে নিতে হবে।
  • নিজের মাঝে প্রফুল্লতা বৃদ্ধি করতে হবে। এজন্য প্রতিদিন কিছুটা সময় মন খুলে হাসুন।
  • নিয়মিত সৃজনশীল কাজ করার চেষ্টা করুন। এটি আপনার চিন্তাশক্তিকে উৎকর্ষতা এনে দিবে।
  • প্রতিদিন পরিবার ও বন্ধুদের সাথে সময় কাটান, মানসিক অবসাদ দূর করতে সাহায্য করবে।

কাল নয় আজ 

উদ্দেশ্য যদি হয় স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা, তবে পরিবর্তনের জন্য কাজ শুরু করুন আজ থেকেই। কালকের জন্য ফেলে রাখবেন না। দেখবেন কালকের সে দিনটা আর আসে না। তাই আজই কোনো একটা অভ্যাস বেছে নিন, আজই শুরু করুন আপনার স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার নতুন যাত্রা।

Avatar
Written by Nanjiba Naowar

Leave a comment